17 April 2016

বর্ষ, হর্ষ, ফর শো

সুস্নাত চৌধুরী


আবার বগল বাজাতে বাজাতে একটা নববর্ষে পা রাখলাম। হ্যাপি নববর্ষ! হ্যাপি... ইয়ে, মানে, এটা ফর্টিন হান্ড্রেড অ্যান্ড কত যেন? এই ভোটের বাজারে সারদা-বিবেকানন্দের ছবি দেওয়া ক্যালেন্ডার টাঙানো খুব রিস্‌কি, আর পাঁজি নামক গ্রন্থটি খরিদ করার বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত বটতলা-স্কলার ছাড়া ইদানীং কে-ই বা নেয়! কাজেই, হয় গুগল করো, নয় খবরের কাগজ খুলে মাস্ট-হেডের তলায় চোখ রাখো। এত পরিশ্রম সয় না বাপু! সন জেনে কাজ নেই, সন্‌সনি সন্দর্ভ তো আর রচনা করছি না! বচ্ছরকার দিনে নতুন আন্ডারওয়্যার পরে একটু ফুর্তি করছি মাত্র। মোটে হাঁটু পর্যন্ত আমোদে সাঁতরাচ্ছি আমরা বাঙালি।
ঘামে-ডিওতে, বিয়ারে-ঘোলেতে লেবড়ে আমাদের ভাবখানা যেন গত বছরটা বিদেয় হয়ে বাঁচিয়েছে – আর নতুন বছরটা জাস্ট আসছিল না বলে! নববর্ষ এসে গিয়েছে, ব্যস, নো টেনশন। সংক্রান্তি কাটিয়ে রাইমা টু মাইমা এবার সকলে দুধে-ঘিয়ে ভাসব – পরীক্ষায় সাপ্লি থাকবে না, অফিসে লেটমার্ক থাকবে না, ফুটপাতে বিপিএল থাকবে না, কেবল ইডেনে আইপিএল থাকবে। ট্রেন চললে ভিড় হবে না, গরমকালে ঘাম হবে না, বৃষ্টি হলে জল হবে না, শুধু চ্যানেল চ্যানেলে সপ্তদিবানিশি মেগা সিরিয়াল আর মেগা সিরিয়াল হবে। তাহলে কথা হচ্ছে গিয়ে, নতুন বছরে কি আর হালকার ওপর লাইট করে এক-আধটা সুচারু ম্যাসাকারও হবে না? সে হবে তো হবে। বড়জোর উগ্রপন্থীরা ক্যাসুয়ালি বিস্ফোরণ ঘটাবে; দেশপ্রেমীরা বিন্দাস দেশদ্রোহীদের কোতল করবে; প্রতিদিন একটা করে ধর্ষণ মাখন হেড লাইন হবে; কিছু নৃসংশ হত্যা সংবাদমাধ্যম বাই-ডিফল্ট চেপে যেতে বাধ্য হবে; এবং লঙ্কা যে অ্যাকুয়ার করবে, মেক-আপ ছাড়া তাকে ডিট্টো রাবণের মতোই দেখতে লাগবে। আর, কেউ হয়তো কমোডে বসে হালকা সুরে গুনগুনাবে... ‘পালটায় সাল, বলো, দিনগুলো পালটাবে কবে?’
তাবলে কি প্রেম দেব না! একশোবার দেব। ইট’স আ হান্ড্রড পারসেন্ট ল্যভ। রাত পোহাতেই ঝিংকুনাকুড় নেচেছি। চ্যানেলে-চ্যানেলে বর্ষবরণের কনফেটি ফাটিয়েছি। গয়নার দোকানে গিয়ে আদেখলের মতো কোল্ড ড্রিংক, মিষ্টি আর ক্যালেন্ডার বাগিয়েছি। ভুল ছন্দে ন্যাকা-ন্যাকা অকবিতায় উইশ এসএমএস করেছি। ফেবু ভরিয়ে দিয়েছি সেলফিপানা চাঁদবদন আর নোলা সক্‌সকে রোমান হরফে – হ্যাপিনেস ইজ সেলেব্রেটিং একলা বৈশাখ উইথ মাই ফেভারিট লুচি, বেগুনভাজা অ্যান্ড মাটনকষা। এইসা মেমফুর্তি না হলে কি আর এই বছরটা তত নতুন-নতুন দেখতে লাগবে! তারপর নয় বছর শুরুর খোঁয়ারি কাটলে আগের মতোই কেউ ঘুষ খাবে, কেউ জুস খাবে, কারো ভাগ্য হোঁচট খাবে তিনশো পঁয়ষট্টি দিন।
অভিধানে তো নতুন মানে, নব। নব মানে, ৯। আর, নয় মানে, না। কাজেই এখন যদি বলি, নতুন বছর বলে আসলে কিছুই হয় না। দিন-ক্ষণের হিসেব রাখতে হয়, তাই এই এককের গণনা পদ্ধতি মেনে চলা। সেই ধান্দাতেই আদ্যোপান্ত নিজেদের বানানো কৃত্রিম এক সূচক হিসেবে সে-এককের শুরুটাকে হালকা হাইলাইট করে নেওয়া। কিন্তু কোনটা সেই প্রকৃত শুরু? কোন সূচনাবিন্দু থেকে সূর্যকে চক্কর কাটতে থাকল পৃথিবী? কেন এইটেই হবে বছরের পয়লা, এখান থেকেই শুরু হবে গোনা, উবু দশ কুড়ি...? আসলে দুনিয়া জুড়ে বিবিধ গোষ্ঠী যে যার ব্যাখ্যা ও সুবিধে মতো ধরে নিয়েছে নববর্ষের দিন, ছেপে গিয়েছে ক্যালেন্ডার। লগ্ন তো সম্রাটের হাতে, পঞ্জিকা কী বলে, কী এসে-যায় তাতে! আর সব অব্দ মুছে-টুছে দিয়ে পয়লা আশ্বিন থেকে যেমন শুরু হয়েছিল হিরকাব্দ, কতকটা সেইরকমই নয় কি? অথচ সেসব ম্যানুফ্যাকচার্ড পয়লা তারিখগুলি এক পাক করে ঘুরে এলে আমরা আবিশ্ব মেতে উঠেছি গভীর আদিখ্যেতায়।
তার মানে এই নয় যে জীবন থেকে হাসি, ফুর্তি, আমোদ-আহ্লাদ মুছে দিতে হবে। সেসব বিলক্ষণ থাকবে। ছিলও তো। ছিল বলেই, ‘আর ঠিক একদিন পর আচ্ছে দিন আনেওয়ালা হ্যায়’ – এই কাউন্টডাউনের মতো খিল্লিকর আর কিছু হতে পারে না। এবং তারই জন্য পেরিয়ে-আসা অতীতকে ‘পুরাতন’ বলে দেগে দেওয়া, তাকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করে ‘ব্র্যান্ড নিউ’-এর ক্লিশে আমোদগেঁড়েমি চালিয়ে যাওয়া অহেতুক ঠেকে। প্রকৃত প্রস্তাবে নতুন-পুরোনো কনসেপ্টটাই যখন এখানে অর্থহীন, তখন কেন এই ফর শো বর্ষবরণ? ফেলে আসা বছরটায় কি মনে রাখার মতো কিছুই ঘটেনি, কোনো স্বপ্নই কি ছিল না সেই বেঁচে থাকায়, তাহলে এই ক’দিনেই কীভাবে তাতে এত জং পড়ে গেল যে বাতিলের দলে না ফেলে দিলেই নয়! উদ্ভট শোনাতে পারে, কিংবা হেঁয়ালির মতো। কিন্তু কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হত যদি আজ আরেকটা নববর্ষে এসে না পৌঁছোতাম! কোন ক্ষতিটা হত যদি এই নতুন বছরটা আদপেই নতুন বছর না হত! তার চেয়ে বরং গেল-বছর যেখানে থেমেছিলাম, এ বছর সেখান থেকেই শুরু করব। মেতে থাকব জীবনের অনন্ত যাত্রায়। যেখানে নতুন বলে কিছু নেই, কারণ পুরোনো বলে কিছু হয় না। বড়জোর মাঝে আসে এক-আধটা ক্ষণিকের বিরতি। তখন এটুকুই আওড়ে নেওয়া যায় –
‘তোমারও তো শ্রান্ত হলো মুঠি
অন্যায় হবে না – নাও ছুটি
বিদেশেই চলো
যে-কথা বলোনি আগে, এ-বছর সেই কথা বলো।’

ছুটি, সংবাদ প্রতিদিন, ১৭ এপ্রিল ২০১৬

15 November 2015

কে বিনে কে ঢুকে গেল

সুস্নাত চৌধুরী



পে-স্লিপ একটা গোপন ব্যাপার। অনেকটা গোপনাঙ্গের মতোই। আছে সবাই জানে; কেমন তার বহর, বাইরে থেকেই মোটামুটি একটা আঁচও করতে পারে, কিন্তু খোলাখুলি সেসব আলোচনার যো নেই। এইচআর-শ্লীলতার মানা! কাজেই, কাজের জায়গায় কলার তুলতে গেলে পে-স্লিপকে আস্তিন থেকে বের করার বদলে খামে ঢুকিয়ে রাখাই বিধেয়। উদ্দেশ্য যদি কর্মক্ষেত্রের ভেতর দেখনদারিত্বই হয়, তবে সে কাজে ইস্তেমাল করতে হয় 'কেবিন' নামক ক্ষমতার অলিন্দটিকে। অলিন্দ, অথচ যা ঘেরা। হয়তো স্বচ্ছ, তবু চারদিকের সেই উলম্ব কাচের নাম তো দেওয়ালই।
কেবিনের তাই এত নম্বর। জন্মগত প্রতিভা হোক বা ডোনেশন-গত এমবিএ – কিছু না কিছুর একটা জোরে অফিসের হাতে-গোনা কিছু মানুষই পারেন নিজের কেবিনটি বাগিয়ে নিয়ে জাঁকিয়ে বসে সেই নম্বর জীবনের খতিয়ানে জমা করে নিতে। অসংখ্য জুল-জুল চোখের ছানাবড়া থেকে গড়িয়ে পড়া নোনতা রসের চোটে ফ্লোর-ম্যাট্রেস তখন রসাতলে। শুধু তিনিই নিস্পৃহ, দেমাকি হাসির স্মৃতিটুকু ঠোঁটে ঝুলিয়ে ভেসে থাকেন বাতাসে। কেবিনে। এঁদের মতো ভার্টিকালি নয়, কিন্তু হরাইজেন্টালি ভেসে বেড়িয়ে, কেবিনের থ্রু দিয়েই আরেক দল লোকও নিজের নম্বর বাড়িয়ে নেন। তাঁরা নিজের কেবিন জোটাতে পারেন না বটে, কিন্তু বসের কেবিনটি বশে আনতে বিশেষ সময় নেন না। সেখানে তাঁদের নিত্য আসা-যাওয়া। দরকারে-অদরকারে, কাপ্পুচিনোয়-লিকারে, সিঙ্গাড়ায়-বার্গারে তাঁরা ঢোকেন আর বেরোন... বেরোন আর ঢোকেন। স্বভাবতই সেসব চাক্ষুষ করতে করতে জমাট হতাশায় চারপাশের ছানাবড়াগুলি আরও রসসিক্ত হয়ে ওঠে। জন্ম নিতে থাকে একঘেঁয়ে কিছু রূপকথা। ক্লান্তিকর কর্পোরেট রাজনীতি। সেসবের কেন্দ্রে ঘুরপাক খায় কেবিনের কল্পলোক।
কেবিন হল উচ্চাকাঙ্ক্ষার এক ফাঁপা আয়তঘনক। অ্যাপ্রাইজাল কি ছাঁটাই, বোনাস কি ইনসেন্টিভ – সব বিধিলিপিই রচনা হয় কেবিনের অন্তরমহলে। কাজের কাজ যেমন সেখানে হয় বটে, তেমনই তার মেঝেও অনেক ক্ষেত্রে অনুগতজনের দাক্ষিণ্যে দিনকেদিন হয়ে ওঠে মসৃন আর তেলতেলেতর। গোড়ালি ফেলে হাঁটতে হয়, নইলে স্লিপস্লিপারি বদহজমের সম্ভাবনা থাকে সমূহ। আর বাইরে যেহেতু নেমপ্লেট উজ্জ্বল সুস্পষ্ট হরফে, অভ্যাসবশে কেবিনটিকে অনেকে নিজের বলেই ঠাওরে নেন। কিন্তু নিজের বলে কি কিছু হয় রে পাগলা! একটু হাওয়া মারলেই হাইকোর্ট প্রান্ত থেকে ছুটে আসা বল সুইং করতে শুরু করে। খেলা তখন ঘুরবেই। কালের নোটিশে মিউজিক্যাল চেয়ারের মতো কেবিনেরও মালিক বদল হয়। আবার নতুন করে শুরু হয় ভার্টিকাল ও হরাইজেন্টাল ভেসে বেড়ানোর খেলা। নতুন আফশোস। নতুন রূপকথা।
তাই যদ্দিন থাকে, তদ্দিনই কেবিন যেন এক সব পেয়েছির দেশ। এক আশ্চর্য প্রদীপ। সেই কেবিনের সাপেক্ষে পারস্পরিক অবস্থান বদলের এক অবদমিত বাসনাই কাজ করে কেবিনের বাইরের অগুনতি চেয়ারে, টেবিলে, কিউবিকলে। ঠিক যেমন দেখি আলাদিন-এর অ্যানাগ্রামে অনিলদা-র মধ্যেও। নক না করে ঘরে ঢোকায় মিস পম্পাকে বিগ বস মিস্টার পাকড়াশির পাকড়ে ধরা দেখে ফেলা আর প্রদীপের দৈত্যর স্বপ্ন-উড়ানে চেপে সেই অবস্থান বদলে নেওয়া। সুবিশাল সেই কল্পচেম্বারে অনিলদাই তখন দাবড়ানি দেন অধীনস্ত হয়ে পড়া পাকড়াশিকে – 'সারাদিন মিস পম্পার ফিগার মাপলেই চলবে, সেলস ফিগার আপডেট করবে কে?' আসলে এ সেই চির-আফশোসেরই শট-ডিভিশন – আমাদেরও নাকি হব্‌বে, কে জানে বাবা কব্‌বে!
কিন্তু, ব্যক্তিগত ভাবে দেখেছি, যার পাঁচে হয় না, তার পনেরোতেও হয় না। ২০০৫ থেকে ২০১৫, পাক্কা দশ বছর ঠায় কেবিনপানে ঝাড়ি মেরে এ আমার অভিজ্ঞতা। কেবিন বখতিয়ার খিলজি সবাই হতে পারে না। কেবিন জয় করতে তো পারেই না, বসের কেবিনে ঢুকে বকবক আসর ফাঁদতে পারার মতো কেবিন বয়ও হতে পারে না সবাই। সর্বভারতীয় এক মিডিয়া হাউসেই দেখেছিলাম, পদাধিকার বলে প্রাপ্য কেবিন ফিরিয়ে দিয়েছিলেন আমারই এক ঊর্ধ্বতন। প্রোমোশন নিয়েছিলেন, ইনক্রিমেন্ট নিয়েছিলেন, কেবিন নিতে পারেননি। লাজুক হয়ে বলেছিলেন, তাঁর অস্বস্তি হবে। বেত্তান্ত শুনে তখন মনে হয়েছিল, এই অস্বস্তিও সেই কেবিনের বাইরে বসে বসে পুঞ্জিভূত হতাশারই বাইপ্রোডাক্ট। চূড়ান্ত মিডিওক্রেসিরই নমুনামাত্র। মাটিতে পা রেখে চলা মানে তো আর চিরকাল খালি পায়ে মাঠে গিয়ে পায়চারি করা নয়! সেই অফিসেই দেখেছিলাম একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা, কোনো কেবিনেই কোনো দরজা ছিল না। সেভাবেই গোটা ইন্টিরিয়রের নকশাটি করা। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছিল, উপরতলা আর নীচতলার মধ্যে যাতে দূরত্ব তৈরি না হয়, তাই এই সিদ্ধান্ত। আরও একটি যুক্তি ছিল অনেকটা এইরকম – যেন স্বচ্ছতা বজায় থাকে, কেবিনের 'ভিতর' নিয়ে যাতে স্পষ্ট ধারণা থাকে 'বাহির'-এর। সেসব স্বচ্ছ ভারতের আগের কথা। ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে কেবিনের স্বচ্ছতা নিয়ে আমার ধারণা আজও অস্বচ্ছই রয়ে গিয়েছে।
আবার আরেক ডালে বসে দেখেছিলাম, কেবিন না পাওয়ার ঘটনা পৌঁছেছিল চাকরিতে ইস্তফা পর্যন্ত। অগ্রজ এক সাংবাদিককে পলিটিক্যাল এডিটর পদে উন্নীত করা হয়। অধিক বেতনের চেয়েও তার জোরাল দাবি ছিল একটি কেবিনের জন্য! সে কেবিন তিনি পাননি। অগত্যা ছেড়েই দেন চাকরি। একই সংস্থায় দেখেছি, অন্য এক সাংবাদিকের ক্ষেত্রে অবশ্য কেবিন-বরাত শিকে ছিঁড়তে। সংবাদ প্রযোজনার বিশেষ দায়িত্বে ছিলেন তিনি। অভ্যন্তরীণ একটি ছোটখাট গোলমালের কারণে ইস্তফা দেন। সে ইস্তফা গৃহীত হয়নি। কিন্তু অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়েও যখন তাঁকে রাজি করানো যাচ্ছে না কিছুতে, তখনই নাকি তাঁর সামনে ফেলা হয় কেবিনের টোপ। এক ছোবলে ছবি! পরদিন সকালেই তিনি সুড়সুড় করে এসে নতুন কেবিনে ঢুকে বসেন। আর চাকরি ছাড়ার নাম করেননি। কেবিন নিয়ে দেমাকের প্রসঙ্গে শুনেছিলাম একটি সংবাদপত্রের বাইরের ঘরের ভেতরের কথা। তার রিসেপশনিস্ট ছিলেন যে মহিলা, চিরকাল তাঁর তুমুল রেলার কারণই ছিল যে সেই অফিসে একমাত্র তাঁরই নাকি কেবিন রয়েছে। জনে জনে সে কথা ফলাও করে বলেও বেড়াতেন। বলা বাহুল্য, গোটা ফ্রন্ট অফিসটিকেই তিনি তাঁর কেবিন ঠাওরে ছিলেন!
সম্ভাবনা আমারও ছিল। আমি চিরকালই ভয়ঙ্কর সম্ভাবনাময়। অনেকটা জাপানের মতো। উদিত সূর্যের দেশ। সূর্য উঠছে তো উঠছেই... কোনোদিনই আর মধ্য গগনে এল না! আমার সম্ভাবনাও সম্ভাবনা হয়েই রয়ে গিয়েছে। তাই চূড়ান্ত সম্ভাবনাময় আমি আজও কোনো কেবিনে ঢুকতে পারলাম না। না পারলাম বুকের দমে প্রেমিকাকে নিয়ে রেস্তোরাঁর গোপন কেবিনে সেঁধাতে, না পারলাম মেডিক্লেমের জোরে সুপার স্পেশালিটির একান্ত কেবিনে ফুটফুটে নার্সদের শুশ্রূষা পেতে। হট্টগোলের বেঞ্চিতে আমাকে চা-টোস্ট দিয়ে বসিয়ে রেখে একে-একে কতজনই না ঢুকে গেল কেবিনে। অঞ্জনের গলায় কেবল শুনেই গেলাম –
ফিরে ফিরে সাতদিন
দাসবাবুর এ কেবিন
কত প্রেমালাপে যায় ভরে,
জায়গা নেই যে কোনো
আমাদের অন্য
তিনশো বছরের শহরে, এই তিনশো বছরের শহরে...


'দাস কেবিন'-এর পর্দা-টানা সেটুকু জায়গাও আমার জোটেনি। জেনারেল বেডে মশার চুম্বন আমার জন্য বরাদ্দ রইল। ঠিক যেমন কেবিনের ভেতর থেকে বাকি অফিসটা কেমন দেখতে লাগে, আজও জানা হল না। এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে, লেখাটির শেষ লাইনে পৌঁছে, এটা আশীর্বাদ না অভিশাপ, নাকি নেহাতই মধ্যবিত্ত থট-প্রসেস, কিছুতেই ডিসাইড করতে পারছি না।

রোববার, সংবাদ প্রতিদিন, ১৫ নভেম্বর ২০১৫